Breaking news

বিড়াল কেন 'বুকফাটা আর্তনাদ' করে? Share
বিড়াল কেন 'বুকফাটা আর্তনাদ' করে?

বিড়াল কেন 'বুকফাটা আর্তনাদ' করে?

আজকের রাতেও কি আপনার ঘুম কেড়ে নিয়েছে আদরের বিড়ালটির সেই বুকফাটা আর্তনাদ? রাতের গভীরতা বাড়তেই ঘরের কোণ থেকে ভেসে আসা কোনো দীর্ঘ, মর্মান্তিক সুর কি আপনাকে বিছানায় সোজা হয়ে বসতে বাধ্য করে? আপনি কি ভেবে কূল পান না যে আপনার এই মিষ্টি পোষ্যটি কেন সবসময় এভাবে ডেকে যায়? অনেকেই মনে করেন ওরা হয়তো কেবল খাবারের জন্যই এমন করছে বা নিছক নাটক করছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এর পেছনের সত্যটি যতটা গভীর, তার চেয়েও অনেক বেশি রহস্যময়। প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, বিড়ালের এই দীর্ঘ কান্নার আসল অর্থ লুকিয়ে থাকে কেবল শব্দের বাইরে গিয়ে ওদের আচরণ ও অনুভূতির গভীরে।

পশু চিকিৎসকদের পরিভাষায়, এই বুকফাটা আওয়াজকে সাধারণত 'য়াওল' বা তীব্র চিৎকার বলা হয়, যা মূলত কোনো আক্রমণাত্মক ভাব বা সঙ্গমের সময়কার তীব্র উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আমরা ঘরের পোষ্যদের ক্ষেত্রে একটু জোরে করা যেকোনো ক্রন্দনকেই এই নামের তালিকায় ফেলে দিই। 

গবেষণায় দেখা গেছে, একেক পরিস্থিতিতে এই শব্দের অর্থ একেক রকম হয়। এমনকি পশুর আচরণ নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত পুরোপুরি একমত হতে পারেন না ঠিক কোন আওয়াজটিকে নিখুঁত 'য়াওল' বলা উচিত। প্যারিস ন্যান্টারে ইউনিভার্সিটির বিখ্যাত আচরণবিদ শার্লট দে মুজোঁর মতে, আপনি যদি একেবারে খাঁটি অর্থে এই শব্দের কথা বলেন, তবে তা সাধারণত একটি তীব্র এবং নেতিবাচক মানসিক অবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে। এটি কোনো সাধারণ কথোপকথন নয়, বরং যেন এক ধরণের মানসিক বিপদের সাইরেন।

সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যাপার হলো, বিপদের এই এলার্ম বেলটি আজকের গৃহপালিত বিড়ালের চেয়েও অনেক প্রাচীন। বর্তমানের এই শান্ত ড্রইংরুমের বাঘগুলোর পূর্বসূরি আফ্রিকান ওয়াইল্ডক্যাটরাও ঠিক এভাবেই চিৎকার করত। মানুষের ঘরে পোষ মানার হাজার হাজার বছর আগে থেকেই তারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখাতে এই প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে। খাদ্য, নিরাপত্তা এবং সঙ্গীর খোঁজে নিজের এলাকা সুরক্ষিত রাখতে প্রাণীকুলে এই ধরনের আঞ্চলিক চিৎকার অত্যন্ত পরিচিত ব্যাপার। ঝগড়ায় লিপ্ত না হয়েও নিজেদের প্রভাব জাহির করার এই আদিম স্ক্রিপ্টটি যেন আজও নিখুঁতভাবে মেনে চলে আপনার আদরের বিড়ালটি।

তবে শুধু নিজের এলাকা রক্ষা করতেই নয়, বিড়াল ভয় পেলে, কোণঠাসা হয়ে পড়লে কিংবা অন্য কাউকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইলেও এমন আর্তনাদ করতে পারে। করনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি বিহেভিয়ারিস্ট ক্যাথরিন অ্যান্ডারসন জানাচ্ছেন, কেউ যদি এমন কান্নারত বিড়ালের খুব কাছাকাছি চলে যায়, তবে বিড়ালটি যেন স্পষ্ট ভাষায় বলতে চায় যে সে যেন আর এক পা-ও সামনে না এগোয়। পশু হাসপাতালের অচেনা পরিবেশ, অন্য বিড়ালের সঙ্গে লড়াই কিংবা সঙ্গমকালীন প্রতিযোগিতাও এই ভয়াবহ শব্দের জন্ম দেয়। অনেক সময় মানুষ একে স্রেফ বিড়ালের চিৎকার ভেবে ভুল করে, কিন্তু গবেষকরা বলছেন এগুলো মূলত তীব্র মানসিক কষ্টের এক অদ্ভুত বহিঃপ্রকাশ।

অবশ্য সব জোরালো শব্দই কিন্তু আসল 'য়াওল' নয়। বিড়ালদের শব্দভাণ্ডার বড্ড বিশাল, আর এর একটা বড় অংশই তৈরি হয়েছে মানুষের সঙ্গে বসবাস করতে করতে। বন্য পরিবেশে প্রাপ্তবয়স্ক বিড়ালরা সাধারণত একে অপরের সঙ্গে মেও করে কথা বলে না। এই অদ্ভুত অভ্যাসটি মূলত শাবকেরা তাদের মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করত। কিন্তু গৃহপালিত বিড়ালরা মানুষের কাছাকাছি থাকতে থাকতে এই শৈশবের স্বভাবটিকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেও ধরে রেখেছে এবং সরাসরি মানুষের দিকেই তা প্রয়োগ করতে শিখে গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মেও শব্দের সঙ্গে মানুষের কোনো ছোট্ট শিশুর কান্নার ধ্বনির আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে, যা মানুষকে বিড়ালের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল করে তোলে।

আপনি যখনই খুব ভোরে বিড়ালের ডাকে ঘুম থেকে উঠে বাটি ভর্তি খাবার সামনে এনে দেন, বিড়ালটি ঠিক তখনই বুঝে নেয় যে এই বিশেষ কৌশলটি দারুণ কাজে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে এই অভ্যাসটি আরও পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে, কারণ বিড়ালটি ভালো করেই জানে যে এই কায়দায় ডাকলেই কাঙ্খিত ফল মিলবে। তবে সবচেয়ে বড় ভয়ের ব্যাপার হলো, হঠাৎ করে বিড়ালের এই অতিরিক্ত কান্নাকাটি কোনো মারাত্মক শারীরিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। 

বিশেষ করে বয়স্ক বিড়ালদের ক্ষেত্রে হাইপারথাইরয়েডিজম বা মানুষের ডিমেনশিয়ার মতো কগনিটিভ ডিসফাংশন সিন্ড্রোমের মতো গুরুতর অসুখ থাকলে এমনভাবে রাতের পর রাত ডেকে ওঠার প্রবণতা দেখা দেয়। তাই স্রেফ বিরক্ত না হয়ে, বিড়ালের বয়সের পাশাপাশি তার চারপাশের পারিপার্শ্বিক অবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত একটাই সত্য ফুটে ওঠে, আর তা হলো বিড়ালরা মানুষের মতো কথা না বলতে পারলেও ওরা সারাক্ষণই আমাদের কিছু না কিছু বোঝানোর চেষ্টাই করে যায়। আসল চ্যালেঞ্জটা বিড়ালকে কথা বলানোর নয়, বরং ওদের না বলা এই গভীর ভাষাটিকে সঠিকভাবে বুঝতে পারার।সূত্র: লাইভ সায়েন্স 

বিবিএন২৪/এমআরকে/১৬ আগস্ট ২০২৬,


Published: 2026-08-16 03:28 am   |   View: 1171   |   Share
Advertisement


Copyright © 2017, Design & Developed By Softech



up-arrow